জরিমানা মওকুফের পরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরের নালা দিয়ে বর্জ্যতেল হালদা নদীতে পড়ছে।

আমাদের গর্ব করার মতো দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদের একটি হালদা নদীকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার শেষমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র। জোয়ার-ভাটার এই নদীতে মিষ্টি পানির মাছের ডিম ছাড়ার ঘটনা পৃথিবীর এক বিস্ময়। এই দুর্লভ সম্পদ আমরা হেলায় হারাতে বসেছি, সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের পেট চিরে একবারে সব কটি ডিম বের করে নেওয়ার খাসলত আমাদের সব রাজনীতি-অর্থনীতি, এমনকি সামাজিক আচরণের মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আমাদের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর হঠকারিতায় হালদা এখন ক্লান্ত অবসন্ন। বাঁক সোজা করা, হালদার বুকে রাবার ড্যাম বসানো, নদীর পারে বাছবিচার না করে কলকারখানা বসানোর অনুমতি, হাঁস-মুরগির খামার গড়তে দেওয়া, পৌরসভার বর্জ্য ফেলা, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য বহন ইত্যাদি নানা মন খারাপ করা বিষয় নিয়ে হালদা সব সময় আলোচনায়, আন্দোলনে, সংসদে, চলচ্চিত্রে ছিল। অনেক দিন পর এ বছর একটা ভালো খবরে বেশ আহ্লাদিত হয়েছিলাম: হালদা নদীতে গত মে মাসে কার্প–জাতীয় মাছ গত ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিম ছেড়েছিল। নদী সুরক্ষায় চলতি বছরের শুরুতেই সরকারের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে নদীর দুই পারের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের খবর বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছিল। তখন কিন্তু চট্টগ্রামে হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, শিল্প, আবাসিক এলাকা ও পাহাড় থেকে নেমে আসা বর্জ্য ও রাসায়নিকে হালদা আশঙ্কাজনকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, মা মাছদের এই উজাড় করে দেওয়া উপহার কি আমরা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারব? মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো।

প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারীতে বন্যা হয়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কয়েক দিন ধরে হালদা নদীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ জলজ প্রাণীরা মরে ভেসে উঠছে। পাহাড়ি ঢল, ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা ঝটিকা বন্যা হালদায় নতুন কিছু নয়। এতে তো আগে কখনো মাছ মরেনি। এবার কেন মরছে? গত বছর হাওরের হাঁস-মাছের মড়কের রহস্য আজও কাটেনি। হালদায় মড়কের কারণ উদ্‌ঘাটনের জন্য মঞ্জুরুল কিবরিয়া সরেজমিনে পরীক্ষায় গিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ টিম নদীর ১০টি পয়েন্টে পানির নমুনা পরীক্ষা করে পানিদূষণের এক ভয়াবহ চিত্র পেয়েছেন। গত প্রায় দুই সপ্তাহের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হালদা নদীতে উজান এলাকার কলকারখানা, পোলট্রি খামারসহ বিভিন্ন শিল্পের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর বর্জ্য প্রায় ২০টি খালের পথ বেয়ে হালদাতে পড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হালদার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া একটি খালও আছে। হালদার কোথাও কোথাও পানির রং এমন বিবর্ণ হয়ে গেছে যে সেসব জায়গায় হালদাকে আর চেনা যায় না।

মঞ্জুরুল কিবরিয়ার সঙ্গে আজ সকালে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বর্তমানে হালদা নদীর পানিতে প্রতি এক লিটারে অক্সিজেনের পরিমাণ দুই মিলিগ্রামেরও নিচে নেমে গেছে। অথচ নদীর পানিতে মাছ বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটারে কমপক্ষে পাঁচ মিলিগ্রাম অক্সিজেন প্রয়োজন। তিনি হালদা নদীতে দূষণ ও মাছ মরে যাওয়ার ঘটনাকে এই নদীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় বলে মনে করেন। তিনি জানান, ভাটির চেয়ে উজানে দূষণের মাত্রা বেশি। তাঁর মতে, এবারের বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরের অক্সিজেন থেকে কুলগাঁও এলাকার আবাসিক বর্জ্য, ভাটি এলাকার পোলট্রি খামার, ট্যানারিসহ বিভিন্ন শিল্পের বর্জ্য ব্যাপকভাবে হালদায় মিশেছে।

তা ছাড়া হাটহাজারী সড়কের পাশেই গড়ে ওঠা পেপার বোর্ড তৈরির কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও হালদায় মিশেছে। এসব বর্জ্য হাটহাজারীর নিম্নাঞ্চলে গিয়ে জমা হয়ে হালদায় প্রাণঘাতী দূষণ ঘটিয়েছে। ফলে হালদার সঙ্গে যুক্ত খন্দকিয়া, কাটাকালি ও মাদারি খাল তিনটিতে বড় বড় মা মাছসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ মরে ভেসে উঠছে। হালদা নদীর মোহনা থেকে উজানে নদীর এক পাশে হাটহাজারীর গড়দুয়ারা, অন্য পাশে রাউজান পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় মরা মাছ ভেসে উঠছে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, গত মঙ্গল ও বুধবার হালদায় ছোট ছোট মাছ মারা পড়লেও গতকাল বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে প্রচুর বড় বড় মৃত মাছ। এর মধ্যে রুই–জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) মাছও রয়েছে। রুই–জাতীয় মাছের মধ্যে ১৫ কেজি ওজনের একটি মৃগেল মাছ পাওয়া গেছে।

বছর কয়েক আগে হাটহাজারীর ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের (পিকিং পাওয়ার) দূষিত ফার্নেস অয়েল ও বজ্রবৃষ্টির পানির ঢলের সঙ্গে মিশিয়ে ছেড়ে দিলে হালদার আশপাশের ছড়া ও শাখা-প্রশাখা খাল দিয়ে হালদা নদীতে ঢুকে দূষিত করে হালদা নদীর মিষ্টি পানি; সে সময় হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার ভরা মৌসুম ছিল। এই দূষিত বর্জ্যের কারণে বহু ডিম সংগ্রহকারীর ডিম নষ্ট হয়। সে খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে পরিবেশ অধিদপ্তর পিকিং পাওয়ার কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করার কথা শোনা গিয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে সেতু ভেঙে খালে পড়া ট্রেনের বগি থেকে ফার্নেস অয়েল মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।

আর দেরি না করে হালদাকে পরিবেশগতভাবে বিপদাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা করে এটা রক্ষণাবেক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় হালদার অন্তর্ভুক্তির পদক্ষেপগুলোকেও আমাদের এগিয়ে নেওয়া উচিত।

গওহার নঈম ওয়ারা: ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

উৎস: প্রথম আলো