বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা: কারণ ও সমাধান

মোঃ নাসিম ফেরদৌস জিম

ভূমিকা

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সৃষ্ট স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। ভোরের সংবাদপত্র হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের মর্মান্তিক দুঃসংবাদ। আজকাল শহর থেকে শুরু করে গ্রামেও রাস্তায় হেটে বা যানবাহনে চলাফেরা রীতিমত বিপজ্জনক হয়ে দাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ও যানবাহন বনাম রাস্তা

বর্তমান বাংলাদেশে লোকসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি (সরকারী হিসাব অনু্যায়ী)। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চলাফেরার জন্য সড়ক পথ যথেষ্ট কম। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলাদেশের সড়ক পথের যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বর্তমানে বাংলাদেশে ২১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে যার মধ্যে মাত্র ৪৮% হাইওয়ে সম্পন্ন। অপরদিকে এ দেশে শুধু মোটর যানবাহনের সংখ্যাই প্রায় ৬ লক্ষ। রিক্সা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি, অটোরিক্সা ইত্যাদি অগণিত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে উন্নত দেশের তুলনায় এগুলো আমাদের দেশে প্রায় ৩০ গুন বেশী।

সড়ক দূর্ঘটনার কারণ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

আমাদের দেশে সড়ক দূর্ঘটনার জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। নানাবিধ কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো-

১. চালকদের অসাবধানতা, অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক।

২. সরু রাস্তা ও রাস্তায় ডিভাইডার না থাকা।

৩. পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন।

৪. প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো এবং ওভারটেকিং দুর্ঘটনার জন্য অনেক বেশি দায়ী।

৫. সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতার অভাব।

৬. সড়ক বিষয়ক আইন প্রয়োগে এবং বাস্তবায়নের যথাযথ অভাব।

৭. প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের অভাব ও ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করা।

৮. বিকল্প যানবাহনের সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকা।

৯. ওভারব্রিজের স্বল্পতা।

১০. সড়কের এবং ফুটপাতের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা।

১১. অতিরিক্ত মালামাল ও যাত্রী বোঝায়।

১২. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পথ অবরোধ, পথসভা, হরতাল প্রভৃতি কারণে যানজট সৃষ্টির ফলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

১৩. সড়ক পরিবহনের সাথে সম্পৃক্ত এক ধরণের কর্মচারীদের দুর্নীতিও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

সড়ক দুর্ঘটনায় গ্রাম ও শহরের চিত্র

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব চিত্র পাওয়া যায় তা সত্যিই ভয়াবহ ও দুঃখজনক। দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা মুহুর্তের মধ্যে ছিনিয়ে নিচ্ছে মানুষের অমূল্য জীবন, ভেঙে দিচ্ছে অসংখ্য সাজানো সংসার। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি। প্রায় দেড়কোটি লোকের তুলনায় এখানে রাস্তা বা রাস্তার যানবাহন কোনটায় যথেষ্ট নয়। আর যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ ও সংকীর্ণ। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা।

ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার হার কম নয়। আজকাল ছোট শহর থেকে শুরু করে গ্রামের দিকেও অনেক বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। এর জন্য মূলত দায়ী অটোরিক্সা, মোটর বাইক, ভ্যান ইত্যাদি।

সারা বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি অসীম। নিম্নে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:

২০১৭ সালে ৮ হাজার ৯৭৯ টি ছোট বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন [সূত্রঃ যুগান্তর, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮] । চলমান বছর ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা পূর্বের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে এবং বাংলাদেশে যাত্রীকল্যান সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্যমতে, সারাদেশে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার মাসেই ১ হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪১ জনের মৃত্যু, ৫ হাজার ৪৭৭ জন আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২৮৮ জন।

এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রচুর পরিমাণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে [সূত্রঃ প্রথম আলো, আগস্ট ২৮, ২০১৭]

এই আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ১.৬ শতাংশ বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ইউএনইসকেপ)। [সূত্রঃ কালের কন্ঠ, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮]

সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক জীবিনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে একটি পরিবারে।

প্রতিকার

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা এবং সরকারের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো নেওয়া যেতে পারে:

১. সাবধানে গাড়ি চালানোর জন্য চালকগণকে উদ্বুদ্ধ করা।

২. অনির্ধারিত স্থানে গাড়ী পার্কিং বন্ধ।

৩. লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে চালকের দক্ষতা ও যোগ্যতা ভালভাবে যাচাই করা।

৪. প্রত্যেক চালককে সচেতন করা এই বিষয়ে যে, গাড়ি রাস্তায় বের করার পূর্বে এর যান্ত্রিক কার্যকারিতা পরীক্ষা করে নেওয়া।

৫. সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তির শাস্তি সিআরপিসি-র ৩০৪(খ) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা। এ শাস্তির মেয়াদ এবং পরিমাণ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

৬. জাল লাইসেন্স বন্ধ করা জরুরী। এ ব্যাপারে আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন।

৭. গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভারকে মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

৮. বীমা আইনের আওতায় বীমার টাকা তোলার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার।

৯. রাস্তায় পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১০. ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারী চলাচলের উপযোগী করে তোলা।

১১. গাড়ির ধারণ ক্ষমতার বাইরে মালামাল ও যাত্রী বহন বন্ধ করতে হবে।

১২. ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

২০১৮ সালে আগস্ট মাসের ১ম সপ্তাহে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর গণআন্দোলনে নামে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। তারা নিজের হাতে ট্রাফিক কন্ট্রোল করে দেশের মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে রোধ করা যায় সড়ক দুর্ঘটনা। তাই সচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের কোন বিকল্প নাই।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি সবার আগে প্রয়োজন। প্রতিটি জীব বা প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে। কিন্তু নিশ্চয় পথের বলি হয়ে কেউ মরতে চায় না। তাই সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি যতই জটিল সমস্যা হোক না কেন; সকলের সামগ্রিক চেষ্টা, সচেতনতার মাধ্যমে এ থেকে রক্ষা পাওয়া খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। তাই “নিরাপদ সড়ক চাই” এ স্লোগানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

লেখক: মোঃ নাসিম ফেরদৌস জিম

সেন্টার ফর ডিজাস্টার এইড (সিডিএ) ।

2018-10-03T20:06:08+06:00October 2nd, 2018|
983 Views

Leave A Comment