বন্যা ও বাংলাদেশ

নাসিম ফেরদৌস জিমভৌগলিক অবস্থান, ভূতাত্তিক গঠন ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ছোট বড় প্রায় ২৩০ টি নদী বয়ে গেছে। মূলত এজন্যই অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বাংলাদেশে বন্যার প্রকোপ বেশি।

বন্যা সাধারণত মৌসুমী ঋতুতে হয়ে থাকে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা (১৮%) বন্যায় প্লাবিত হয়। অতীতে বন্যা বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিশেষ করে ১৯৬৬, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮ এবং ২০১৭ সালে। অর্থ্যাৎ দেখা যায়, প্রতি ১০ বছর পর বাংলাদেশে একটি বড় বন্যা হয়ে থাকে।

বন্যা কি?

বন্যা বাংলাদেশের একটি সাধারণ ঘটনা। বন্যা তুলনামূলকভাবে পানির উচ্চ প্রবাহ, যা কোন নদীর প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম তীর অতিক্রম করে ধাবিত হয়। তীর ছাড়িয়ে পানি আশপাশের সমভূমি প্লাবিত করলে সাধারণত জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্লাবনভূমি যেহেতু মানুষের বসবাসের ও কৃষিকাজের সহায়ক, তাই বন্যাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা ও এর ক্ষয়ক্ষতি যাতে সীমা ছাড়িয়ে না যায় তা লক্ষ্য করা জরুরী।

বাংলাদেশে বন্যার সংজ্ঞা স্বতন্ত্র। বর্ষাকালে যখন নদী, খাল, বিল, হাওর ও নিচু এলাকা ছাড়িয়ে সমস্ত জনপদ পানিতে ভেসে যায় এবং ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সহায়-সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে, তখন তাকে বন্যা বলা হয়। [সোর্সঃ বাংলাপিডিয়া]

বন্যার প্রকারঃ

বাংলাদেশে সংঘটিত বন্যাকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়:

ক) মৌসুমি বন্যা (Monsoon flood) – এই বন্যা ঋতুগত, নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে উঠানামা করে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

খ) আকস্মিক বন্যা (Flash flood) – আকস্মিক পাহাড়ি ঢল অথবা স্বল্প সময়ে সংঘটিত প্রবল বৃষ্টিপাত থেকে কিংবা প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট বাঁধ ভেঙে সংঘটিত হয়।

গ) শহুরে বন্যা (Urban Flood) – শহুরে বন্যা, আকস্মিক কিংবা নদী বা উপকূলীয় বন্যা দ্বারা ঘটতে পারে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে উন্নত এলাকার উপর হয়ে থাকে।

ঘ) জোয়ারসৃষ্ট বন্যা (Tidal flood) – সংক্ষিপ্ত স্থিতিকাল বিশিষ্ট এই বন্যার উচ্চতা সাধারণত ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

Flood In Bangladesh

ছবিঃ বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ এলাকা।

বন্যার কারণঃ

বাংলাদেশের বন্যার জন্য প্রাকৃতিক এবংমানবসৃষ্ট উভয় কারণ দায়ী।

প্রাকৃতিক কারণঃ

১) সাধারণভাবে নিম্ন উচ্চতাবিশিষ্ট ভূসংস্থান যার উপর দিয়ে প্রধান প্রধান নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীগুলি তাদের শাখা-প্রশাখা এবং উপনদীর সমন্বয়ে ঘন বিন্যস্ত নিষ্কাশন জালিকা গড়ে তুলেছে;

২) দেশের বাইরে নদ-নদীর উজান এলাকায় এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারি বৃষ্টিপাত;

৩) হিমালয় পর্বতে তুষার গলন এবং প্রাকৃতিকভাবে হিমবাহের স্থানান্তর সংঘটন;

৪) পলি সঞ্চয়নের ফলে নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া/নদীর পার্শ্বদেশ দখল হয়ে যাওয়া/ভূমিধ্বস সংঘটন;

৫) প্রধান প্রধান নদীসমূহে একসঙ্গে পানি বৃদ্ধি এবং এক নদীর ওপর অন্য নদীর প্রভাব বিস্তার;

৬) জোয়ারভাটা এবং বায়ুপ্রবাহের বিপরীতমুখী ক্রিয়ার ফলে নদনদীর সমুদ্রমুখী প্রবাহ ধীরগতি প্রাপ্ত হওয়া (back water effect);

৭) সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া;

৮) ভূ-গাঠনিক বিশৃঙ্খলা (ভূমিকম্প, নদীর প্রবাহ ও ভূরূপতত্ত্বে পরিবর্তন)। [সোর্সঃ বাংলাপিডিয়া]

মানবসৃষ্ঠ কারনঃ

১. দ্রুত নগরায়ণ (Rapid Urbanization) – জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে দ্রুত নগরায়ণ ঘটে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য ভবন ও রাস্তা নির্মানের পাশাপাশি বেশি পানির দরকার পড়ে এবং পানি প্রবাহিত হবার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে শহরে বন্যার সৃষ্টি হয়।

২. বনভূমি উজাড় (Deforestation) – আমরা বনভূমি উজাড় করি। বনভূমি বন্যার সময় ঘড়বাড়ি, মানুষ ও গবাদীপশুদের ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং পানির গতি কমিয়ে দেয়, সাথে সাথে নদীভাঙন ও ভূমিধ্বস রোধ করে। বনভূমি উজাড় করার কারণে বন্যাতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।

৩. বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ( Global Warming) – জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

৪. বিশুদ্ধ পানির চাহিদা বৃদ্ধি (Fresh Water Demand) – জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা বেড়েছে। নদীর পানি অধিক ব্যবহার করার কারণে নদীর পলিমাটির জমাট বাধা স্তর নষ্ট হয়ে যায়। পানি প্রবাহের সাথে পলি নদীর গভীর অংশে পতিত হয় ফলে নদীর গভীরতা হ্রাস পায় এবং নদীর পানি ধারন ক্ষমতা কমে যায় ফলস্বরূপ বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

বন্যার প্রভাবঃ

ছোট-বড় উভয় বন্যার ক্ষেত্রে কিছু ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষণীয়।

১. অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিঃ বন্যার কারণে ঘরবাড়ি, রাস্তা, আবাদি জমি সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়। মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। দেশের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং আক্রান্ত মানুষদের পুনর্বাসনে অনেক সময় এবং অর্থ খরচ হয়।

২. পরিবেশগত ক্ষতিঃ বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যার কারণে পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে। কৃষিজমির সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশে যায়, গাছপালা উপড়ে ফেলে, নদীভাঙ্গন ঘটায়।

৩. মানুষ এবং পশুপাখির ক্ষতিঃ বন্যার কারণে মানুষ এবং গবাদীপশু মারা যায়, গাছপালা নষ্ট হবার ফলে পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হয়। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায় না, খাদ্যের অপ্রতুলতার কারণে মানুষ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

৪. উৎপাদন হ্রাসঃ বন্যার প্রভাবে মানুষের ফসল উৎপাদন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্য কমে যায়। বন্যার কারণে পানি জমে থাকে ফলে কোন কিছু উৎপাদন করা সম্ভব হয়ে উঠে না।

৫. স্থানান্তরঃ বন্যার কারণে মানুষ এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায়। ফলে অন্য এলাকার উপর অতিরিক্ত মানুষের জন্য চাপ পড়ে এবং মানুষ নানাধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়।

প্রশমনঃ

বন্যার প্রশমন সাধারণত দুই ভাবে করা যেতে পারে। ক) অবকাঠামোগত ও খ) অ-কাঠামোগত।

ক) অবকাঠামোগত বন্যা নিয়ন্ত্রণ যেখানে শারীরিক কাঠামো নির্মিত বা পৃথক বৈশিষ্ট্য বা পুরো জমির উপর বন্যার প্রভাব কমাতে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

১. বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ব্রিজ এবং কালভার্ট সহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মান।

২. ড্রেনের চ্যানেল এবং ড্রেনের অবকাঠামো এর উন্নয়ন করা বা সম্প্রসারণ করা।

৩. সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল বৃক্ষরোপন করা। বিশেষ করে নদী বা সাগরের উপকুলে।

৪. সিমেন্টের ব্লক তৈরী করে সেগুলো নদীর পাড়ে ভালোভাবে আটকানো, যাতে বন্যার সময় নদীভাংগন না ঘটে।

৫. নদীর পাড়ে বালুর বস্তা রাখা, বালু পানি শোষণ করে একসাথে আটকে থেকে শক্ত কাঠামো গঠন করে।

 

খ) অ-কাঠামোগত পদক্ষেপ বলতে বন্যা মোকাবিলায় সামাজিক অভিযোজনকে বোঝানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:

(১) জনগণ যাতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে সে লক্ষ্যে বন্যার পানির উচ্চতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সময় পূর্বে জনগণের কাছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে জোরদার করা;

(২) নদ-নদীর উপচে পড়া পানি হ্রাসের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা সাধন। এ উদ্দেশ্যে বনায়ন এবং পুনর্বনায়নের সমন্বিত কর্মসূচী গ্রহণ ও তার যথাযথ সংরক্ষণ যাতে পরিশোষণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যার পানির উচ্চতা হ্রাস ঘটতে পারে;

(৩) ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগ, শস্য উৎপাদন বহুমুখীকরণ তথা, বন্যা প্রতিরোধী বা বন্যা সহনক্ষম শস্য চিহ্নিতকরণ ও রোপণ করা এবং শস্য রোপণ মৌসুমের অভিযোজন;

(৪) প্লাবনভূমিসমূহকে বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করা এবং উন্নয়ন কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভূমি ব্যবহার জোন তৈরি করা। অ-কাঠামোগত পদক্ষেপসমূহ স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। [সোর্সঃ বাংলাপিডিয়া]

(৫) GIS (Geographic Information System) এর মাধ্যমে বন্যাপ্রবন এলাকা চিহ্নিত করা।

 

উপসংহারঃ

বন্যা এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা আমরা চাইলেই রোধ করতে পারব না। তাই বন্যার প্রভাব মোকাবেলা করা এবং অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ কেবলমাত্র সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব। সুতরাং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, সাথে সাথে বন্যার সময় জরুরী ত্রাণ দেবার প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা, বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মানে সহায়তা করতে হবে। সর্বোপরি মানসম্মত ও নিয়ম মেনে বন্যা মোকাবেলার অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে এবং মানুষকেও সচেতন হতে হবে তাহলেই তারা নিজেদের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক: মোঃ নাসিম ফেরদৌস জিম

সেন্টার ফর ডিজাস্টার এইড (সিডিএ) ।

2018-10-03T08:15:14+00:00July 13th, 2018|
275 Views

Leave A Comment