নদীভাঙন ও বাংলাদেশ

মোঃ নাসিম ফেরদৌস জিমবাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ছোট বড় অনেক নদী। নদীর পানি প্রবাহের কারণে আমাদের দেশে প্রায় প্রতিবছর নদীর আশেপাশে ভাঙন দেখা যায়। এতে করে মানুষ সহ পরিবেশের অনেক ক্ষতি সাধন হয়।

নদীভাঙন (Riverbank erosion)  বাংলাদেশের একটি স্থানীয় ও পুনঃসঙ্ঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদী যত পরিণত পর্যায়ে এগোতে থাকে (যেমন: তিন প্রমত্ত নদী– গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার ক্ষেত্রে ঘটেছে) ততই সেগুলি মন্থর ও বিসর্পিল (meander) অথবা বিনুনি  (braid) আকৃতির হতে থাকে, নদীর এ দোলন নদীতীরের ব্যাপক ভাঙন সংঘটিত করে। প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেতের ফসল, ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫% প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ৪৮৯টি থানার মধ্যে প্রায় ৯৪টি থানায় নদীভাঙন ঘটছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এর সঙ্গে আরও ৫৬টি থানার সন্ধান পেয়েছেন যেখানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে প্রায় ১০০টি থানায় নদীভাঙন ও বন্যার দুর্ভোগ প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি থানা সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ অবজার্ভার পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ১৯৯৩ সালের জুন মাসে ১৬টি জেলায় ২৫০০০-এর বেশি পরিবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে বসতভিটাচ্যুত হয়েছে। [উৎস: বাংলাপিডিয়া]

কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও মানিকগঞ্জ জেলা যমুনা নদী বরাবর ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। পদ্মা নদী বরাবর রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, শরিয়তপুর ও চাঁদপুর জেলা রয়েছে যা ভাঙন প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত।

ব্রক্ষপুত্র নদ (কুড়িগ্রাম)

ছবি: নদীভাঙন (ব্রক্ষপুত্র নদ, কুড়িগ্রাম)।

নদী ভাঙনের কারণগুলি:

বন্যা: বাংলাদেশে উপকূলীয় সহ 700 নদী প্রায় ২4,140 কিলোমিটার জুড়ে একটি ভাল জলপথ গঠন করে। দেশের অধিকাংশ জমি নদী দ্বারা আনা বালি মাধ্যমে গঠিত হয়। আমাদের দেশে, প্রতি বছর বন্যার কারণে মানুষ বিশেষত বর্ষার কারণে প্রভাবিত হয়। নদীর তীরে ক্ষয়ক্ষতির জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

বনভূমি কাটা: বনভূমি বলতে বন বা অরণ্যকে বোঝায়। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত ধরে রাখে। কিন্তু যখন গাছ কাটা হয়, তখন মাটির কণা হ্রাস পায় এবং এই কারণে নদী তীরের মাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।

ভারি বৃষ্টিপাত: আমরা মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে আছি। আমরা বৃষ্টির সময় ভারী বৃষ্টিপাতের সম্মুখীন হয়। এই চরম বৃষ্টিপাত নদীর তলদেশ ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

নদীর তীব্র স্রোত: আমাদের দেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ইত্যাদি। এই নদীগুলির কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল রয়েছে যেখানে অন্যান্য নদীর চেয়ে স্রোত অনেক বেশি। ঐ অঞ্চলগুলি ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে সবসময়।

পলি জমা : ভূমিধস এবং অন্যান্য অপরিকল্পিত বাঁধ এবং রাস্তা নির্মাণের জন্য পাহাড়ের ধ্বংস, যা নদীর নদীগুলির উপনদীগুলির নীচের তলদেশে প্রচুর পরিমাণে বালি বহন করে। যা নদীর তলদেশে জমা হয়। ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং পানির অতিরিক্ত চাপের কারণে নদীটির দিক পরিবর্তিত হয়।

নদী ভাঙনের প্রভাব:

  • আবাসস্থল ধ্বংস।
  • ভাঙন অঞ্চলের শিক্ষা কাঠামোর উপর নেতিবাচকভাবে প্রভাব পড়ে।
  • বেকারত্বের সমস্যা বেড়ে যায়
  • সমাজে দারিদ্র্যতা নেমে আসে।
  • পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
  • কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
  • ফসলের ক্ষতি হয়।
  • ভূমিহীন শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি
  • জমিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
  • কম বিনিয়োগ
  • ক্ষয়প্রাপ্ত মাটির উর্বরতা প্রভাবিত হয়।

নদীভাঙন রোধে করণীয়ঃ

  • নদীর পাশে বেশি পরিমাণ গাছ লাগাতে হবে।
  • নদীর কিনারায় বালুর বস্তা ফেলতে হবে।
  • নদীর কিনারায় Interlocking সিমেন্ট কংক্রিট ব্লক তৈরি করা।

সংক্ষেপে বলা যায়, প্রতি বছর নদীর তীরে ক্ষয়ক্ষতির কারণে আমাদের দেশের মানুষের উপর অনেক প্রভাব পড়ে।  আমাদের দেশের সরকার এবং কিছু স্বীকৃত এনজিও নদীর তীরে ক্ষয়ক্ষতির প্রভাবের পরিমাণ কমাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে এমন কিছু দুর্দান্ত ফলাফল খুঁজে বের করতে আমাদের গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা উচিত।

 

লেখক: মোঃ নাসিম ফেরদৌস জিম

সেন্টার ফর ডিজাস্টার এইড (সিডিএ) ।

2018-10-23T23:26:45+06:00October 23rd, 2018|
307 Views

Leave A Comment