আমরা জানি, পৃথিবী পশ্চিম-পূর্বে ঘূর্ণনশীল। তবে মনে একটি চিন্তা অনেক সময় কৌতুহলবশত জাগতে পারে যে, কাল্পনিকভাবে একটি বল যদি ক্ষিপ্রগতিতে  উত্তর দক্ষিণ মুখে নির্দিষ্ট বিশাল দূরত্বে ছোড়া হয় তাহলে তো তা সঠিক স্থানে না পড়ে ডানে বা বামে পড়বে। কেননা বলটি তো সোজাই গিয়েছিল, কিন্ত ঘূর্ণনের কারণে পৃথিবীর যে স্থানে পড়ার কথা সে স্থানটি কিছুটা দূরে সরে গিয়েছে।

এর উত্তরটি একটু জটিল। বিষয়টির মূলে রয়েছে কোরিওলিস বল ও তার প্রভাব।

পদার্থবিদ্যার আলোকে কোরিওলিস বল

কোরিওলিস বল সম্পর্কে জানতে কয়েকটি বিষয় জরুরি। যা হল- প্রসঙ্গ কাঠামো এবং ঘূর্ণনের দিক।

প্রসঙ্গ কাঠামোঃ যে বস্তুর সাপেক্ষে অন্য কোন বস্তুকে সুনির্দিষ্ট করা হয় তাই প্রসঙ্গ কাঠামো। এক্ষেত্রে পৃথিবীকে ঘূর্ণনশীল জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঘূর্ণনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলোচিত- ঘড়ির কাটার দিকে  এবং ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘূর্ণন।

আমাদের পৃথিবী উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরে।

গতিশীল প্রসঙ্গ কাঠামো পৃথিবীর এ ঘূর্ণনগতির জন্য কোন গতিশীল বস্তুসমূহের নিজের গতির ডানে বা বামে বিচ্যুতি লক্ষ করা যায়। এই বিচ্যুতিকেই কোরিওলিস বল বলা হয়ে থাকে

কোরিওলিস বলের প্রভাব

এ বলের প্রভাবে বিষুব রেখা হতে উত্তর মেরু পর্যন্ত প্রশস্ত উত্তর গোলার্ধে বস্তুসমূহের গতির দিকে সাথে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বিচ্যুতি ঘটে।

সমুদ্রের স্রোত এবং বায়ুপ্রবাহ এ নিয়ম মেনে চলে। সেই কারণে বড় বড় সাইক্লোন, হ্যারিকেন, টর্নেডোর জন্য এই বল দায়ী।

বিষয়টি ভাল করে বোঝার জন্য নিচের প্রেক্ষাপটগুলো লক্ষ্য করা যাক।

 

প্রেক্ষাপট ১

কল্পনা করা যাক, ফ্রেড বিষুবরেখার কাছাকাছি মেক্সিকো উপকূলে A বিন্দুতে রয়েছে। সে একটি ক্রিকেট বল সোজা উত্তর মেরুর নিকটবর্তী তার বন্ধু লিলির নিকট কানাডা বরাবর B বিন্দুতে পাঠাল।

কোরিওলিস বল ১

উত্তর গোলার্ধের কোরিওলিস প্রভাব ১

বলে রাখা ভাল, পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরে। কিন্ত সব প্রান্ত সমান গতিতে ঘূর্ণন সম্পন্ন করে না। উত্তর দক্ষিণ মেরুপ্রান্ত কিছুটা চাপা তাই এই দু’অক্ষের ব্যাস সবচেয়ে কম। পক্ষান্তরে বিষুবরেখায় ব্যাস সবচেয়ে বেশি। বিষুবরেখা থেকে যত উত্তর বা দক্ষিণ দিকে যাওয়া যায় অক্ষাংশের ব্যাস তত কমতে থাকে।

তাই, একটি নির্দিষ্ট সময়ে উত্তর বা দক্ষিন মেরুর কোন অঞ্চল যে গতিতে ঘুরবে বিষুবরেখায় তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে ঘুরে আসবে।

তাহলে, ফ্রেড A বিন্দু থেকে সোজা বল প্রেরণ করল। কিন্ত আগেই বলা হল, উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরছে সেহেতু বলটি বাম দিকে বিচ্যুত হওয়ার কথা। কিন্ত বিষুবরেখার ব্যাস মেরুর চেয়ে অনেক বেশি । সেহেতু A বিন্দু B এর চেয়ে অনেক দ্রুত ঘূর্ণন সম্পন্ন করে।

ফলে A বিন্দু হতে বলটি B বরাবর যেতে যেতে ডানদিকে আটলান্টিক মহাসাগর বরাবর বেঁকে যাবে।

 

প্রেক্ষাপট

এখন ধরা যাক, বলটি লিলি উত্তর মেরু A হতে B বিন্দু (মেক্সিকো) বরাবর প্রেরণ করবে। উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরায় বলটি উত্তর মেরু A থেকে B পর্যন্ত পৌছাতে বামদিকে আটলান্টিক বরাবর বেঁকে যাবার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে উত্তর মেরু A এর চেয়ে B এর ব্যাস বেশী হওয়ায় B বরাবর পৌছাতে বলটি প্রশান্ত মহাসাগর বরাবর নিজের গতির ডানদিকে বেঁকে যাবে।

কোরিওলিস বল ২

উত্তর গোলার্ধের কোরিওলিস প্রভাব ২

সুতরাং, বোঝা গেল উত্তর গোলার্ধে গতিশীল বস্তু সর্বদা তার নিজের গতির ডানদিকে বেঁকে যাবে।

 

প্রেক্ষাপট ৩

এবার তাহলে দক্ষিণ গোলার্ধের কথা বিবেচনা করা যাক। ফ্রেড এবার দক্ষিণ আমেরিকার A বিন্দু থেকে দক্ষিণ মেরুর দিকে তার বন্ধু লিলি কে B বিন্দুতে বলটি পাঠাবে। দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘূর্ণনের জন্য বলটির বিচ্যুতি আপাতভাবে ডানদিকে হওয়ার কথা।

কোরিওলিস বল ৩

দক্ষিন গোলার্ধের কোরিওলিস প্রভাব ১

 

কিন্ত B বিন্দুর চেয়ে A বিন্দুর ব্যাস অনেক বেশী হওয়ায়, বলটির বিচ্যুতি বাম দিকে ঘটে এবং তা আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে কিছুটা বেঁকে যায়।

 

প্রেক্ষাপট ৪

এবার, দক্ষিণ মেরু হতে লিলি ফ্রেডকে A হতে B বিন্দু বরাবর বলটি ছুড়ে মারে। কিন্ত এবার আশ্চর্যজনকভাবে বলটি প্রশান্ত মহাসাগরের দিক বরাবর কিছুটা বাম দিকে বেঁকে যায়।

 

কোরিওলিস বল ৪

দক্ষিন গোলার্ধের কোরিওলিস প্রভাব ২

কারণ, ঘূর্ণন ঘড়ির কাটার দিকে সম্পন্ন হয় এবং মেরুর ব্যাসের চেয়ে B বিন্দুর ব্যাস অনেক বেশী হওয়ায় তা দ্রুত ঘুরে। ফলে বলটি বামে সরে যায়।  (PrepMate Edutech, n.d.)

অতএব, বোঝা গেল দক্ষিণ গোলার্ধে গতিশীল বস্ত নিজের গতির বামদিকে বিচ্যুত হয়।

 

সহজ পরীক্ষা

উপরের বিষয়টি সহজ একটি পরীক্ষার দ্বারা আরো ভালভাবে বোঝা সম্ভব। একটি গোল বৃত্তাকার কাগজ নিয়ে তার কেন্দ্র ছিদ্র করে পিন দিয়ে আটকাতে হবে। একটি স্কেল এক প্রান্ত হতে কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে অপর প্রান্ত বরাবর রাখতে হবে।

প্রথমে বৃত্তটিকে উত্তর গোলার্ধ বিবেচনা করা যাক। তাহলে কাগজটিকে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘোরাতে হবে। সাথে সাথে পেন্সিলের সাহায্যে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দিকে স্কেল বরাবর দাগ টানতে হবে।

কোরিওলিস বল ৫

উত্তর গোলার্ধে কোরিওলিস প্রভাব

দাগ টানা শেষে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যদিও সোজা দাগ টানা হয়েছিল। কিন্ত সেটি অপর প্রান্ত পর্যন্ত আসতে আসতে তার গতির ডান দিকে বেঁকে গেছে। (Met Office – Learn About Weather, n.d.)

ঠিক এবার দক্ষিণ গোলার্ধের কথা বিবেচনা করি। তাহলে বৃত্তটিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরাতে হবে। এবার পেন্সিল দিয়ে দাগ টানলে দেখা যাবে দাগটি বাম দিকে বেঁকে গেছে।

কোরিওলিস বল ৬

দক্ষিন গোলার্ধে কোরিওলিস প্রভাব

সারমর্ম

উপরের আলোচনা ও পরীক্ষা দ্বারা বোঝা গেল কোন গতিশীল বস্ত কোরিওলিস বলের প্রভাবে উত্তর গোলার্ধে নিজের গতির ডান এবং দক্ষিণ গোলার্ধে নিজের গতির বাম দিকে বেঁকে যায় বা বিচ্যুত হয়।

বাতাস ও স্রোত মূলত অঘূর্ণনশীল কাঠামোর ক্ষেত্রে উচ্চ-নিম্ন বায়ুচাপ অঞ্চলে প্রবাহিত হবার প্রবণতা দেখায়। কিন্ত কোরিওলিস বলের প্রভাবের জন্যই বাতাস ও সমুদ্রের স্রোত উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে যথাক্রমে নিজ গতির ডান ও বামে বিচ্যুত হয়ে প্রবাহিত হয়। এই বিচ্যুতির জন্য অনেক সময় বড় বড় ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো সৃষ্টি হয়ে থাকে।

 

তথ্যসূত্র

  1. PrepMate Edutech. (n.d.). Coriolis Force. Retrieved from https://www.youtube.com/watch?v=bFp3Q7LivJA
  2. Met Office – Learn About Weather. (n.d.). The Coriolis effect in action. Retrieved from https://www.youtube.com/watch?time_continue=4&v=WB4dxpUS530

 

লেখক: মোঃ হাসানুজ্জামান

সেন্টার ফর ডিজাস্টার এইড (সিডিএ) ।