৮ মের ঘটনা। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের টংঘর এলাকার ধানের খোলায় ছেলে আবু সালেহ (২৫) আর জামাতা সমরুজ মিয়াকে নিয়ে ধানমাড়াইয়ের কাজ করছিলেন মুসলিম মিয়া (৭৫)। বৈশাখ মাসে সাধারণত বিকেলের দিকে ঝড়বৃষ্টি হয়, তাই সকালের সময়টা নিরাপদ ভেবে ফজরের নামাজ পড়েই তাঁরা কাজে নেমে পড়েন। কিন্তু সেদিন সাতসকালেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। বাজ পড়ে আকাশ কাঁপিয়ে। খোলাতেই মারা যান মুসলিম মিয়া, আহত হন ছেলে আবু সালেহ আর জামাতা সমরুজ। একই দিনে বজ্রপাতে আহত হন দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়নের মজিবর রহমান এবং জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের হটামারা গ্রামের তৈয়বুর রহমান (১৬), আবদুর রহমান (১৬) ও নবী হোসেন (২৩)। এঁরা সবাই এখন কোনো না কোনো শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

২ মে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের গোপীনাথপুর গ্রামের আবদুল আজিজ বজ্রপাতে আহত হন। তিনি এখন কানে কিছুই শোনেন না, অস্বাভাবিক আচরণ করেন, কথা বলতে অসুবিধা হয়, শ্বাসকষ্ট এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী। রায়গঞ্জ পৌর এলাকার গুনগাতিতে নিজের ছোট্ট মুদি দোকানে বসা অবস্থায় গত ২৫ এপ্রিল বজ্রপাতে আহত হন মজনু মিয়া (৫০)। বাজের প্রচণ্ড শব্দে তিনি জ্ঞান হারান। তিনি এখন খুব অসুস্থ। কথা বলতে পারছেন না। একই দিন একই এলাকার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আমিনা ও তার বাবা বেল্লাল হোসেনের চোখমুখ ঝলসে যায় বাজের তাপে। এখন তাদের দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ।

বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার পর এতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলেও আহত ব্যক্তিদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। নিহত ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই আর্থিক অবস্থা বিবেচনা বা পরিমাপের সূচক কী? চেয়ারম্যানের সুপারিশ নাকি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে হাঁটাহাঁটি করার ক্ষমতা। এর মধ্যে লোকপ্রিয় ঘোষণায় করিতকর্মা শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী গত ৩০ এপ্রিল মে দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিখেতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা গেলে দুই লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই টাকা নবগঠিত ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া হবে বলে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান। এই টাকা কি শুধু আওয়াজ, না আসলেই দেওয়া হবে—কখন কীভাবে কার হাত দিয়ে কত দিনের মধ্যে দেওয়া হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

গাইবান্ধা সদরের কামারজানি এলাকার কুন্দেরপাড়া হাইস্কুলের বাজারে চায়ের দোকান চালানো ১০ বছরের মেয়েটি কিন্তু এখনো বজ্রপাতে তার বাবা মারা যাওয়ার ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি। যাই হোক, একদিন না একদিন টাকা যাবে তাদের কাছে। কিন্তু আহত ব্যক্তিদের কী হবে? তাদের চিকিৎসার কী হবে? বজ্রপাতে আহত অনেককেই সারা জীবন নানা স্নায়বিক বিপর্যয় নিয়ে দিন কাটাতে হয়। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে আহত ব্যক্তিরা কানে একেবারেই শুনতে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে প্রকট আর দৃশ্যমান সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এ ছাড়া স্মৃতিভ্রষ্টতা, মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করার ক্ষমতা লোপ পাওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, অনিদ্রা—এসব আহত ব্যক্তিদের নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকে।

কথা বলে দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই বজ্রপাতে আহত হওয়ার সময়টা মনেই করতে পারেন না। গবেষকেরা বলছেন, বজ্রপাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্কের অণুকোষগুলো; বাজের সঙ্গে তৈরি হওয়া বৈদ্যুতিক তরঙ্গ অণুকোষগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। আহত ব্যক্তিদের শরীর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বজ্রাঘাত অনেকটা বুলেটের আঘাতের মতো শরীরে ঢোকা আর বের হয়ে যাওয়ার দুটি চিহ্ন রেখে যায়।

বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে অনেক দিন থেকে গবেষণা করছেন মার্কিন চিকিৎসক মেরি অ্যান কুপার। তিনি দেখেছেন, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিরা অন্যদের মতো মাথা খাটিয়ে কাজ করতে পারেন না। কানে কম শোনা, পেশি আটকে যাওয়া আর মাঝারি থেকে বড় রকমের স্নায়বিক বিপর্যয় খুবই সাধারণ ঘটনা।

আহত মানুষের সংখ্যা কত?

ক্ষতিপূরণের নিয়ম চালু হওয়ায় আমরা যেভাবে লাশের হিসাব রাখছি, সেভাবে কিন্তু আহত মানুষের হিসাব রাখছি না। যেকোনো দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির চেয়ে আহত ব্যক্তির সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। যেসব দেশে প্রতিটি ঘটনার হিসাব রাখা হয়, সেসব দেশে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির চেয়ে আহত ব্যক্তির সংখ্যা দ্বিগুণের কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১০০ থেকে ৬০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় আর আহত হয় প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জন।

আরেক হিসাবে দেখা যায়, বজ্রাঘাতে আহত প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন মারা যায়, আর বেঁচে যায় নয়জন। এই নয়জনেরই কম-বেশি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ দেশে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত যদি তিন হাজার মানুষ বজ্রপাতে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে কমপক্ষে এর তিন গুণ, অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য অপেক্ষায় আছে। তারা একসময় কর্মক্ষম ছিল, মাঠঘাটে কাজ করত। চিকিৎসার অভাবে তারা ক্রমেই নির্জীব হয়ে পড়ছে। শারীরিক সমস্যা সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।

কী করা প্রয়োজন?

ক্ষতিপূরণের ঘোষণা থেকে আঁচ করা যায়, টাকা সমস্যা নয়। এই টাকা দিয়ে নিহত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে সেলফি তোলা যায়, আবার গঠনমূলক সুদূরপ্রসারী টেকসই কাজও করা যায়। আমাদের দেশে বজ্রপাতে আহত রোগীদের চিকিৎসার কোনো প্রটোকল এখনো তৈরি হয়নি। আগুনে পোড়া আর বাজে পোড়া যে এক জিনিস নয়, সেটাও আমাদের বুঝতে হবে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মেডিকেল কলেজগুলোকে এ বিষয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি ও হালনাগাদের দায়িত্ব দিতে হবে। বজ্রপাতের রাজধানী হিসেবে ‘খ্যাত’ দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ে বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ওপর ধারাবাহিক গবেষণা চলছে। এসব গবেষণায় এখন তারা প্রকৌশলীদের পাশাপাশি চিকিৎসকদের সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক এবং বায়োমেডিকেল বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করছে। ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে প্রতিশ্রুত আমাদের বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের একটা নবায়নযোগ্য চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করা প্রয়োজন।

আহত ব্যক্তিদের হতাশার মধ্যে ফেলে না রেখে সামাজিক পুনর্বাসনের একটা কর্মসূচি এখনই চালু করা প্রয়োজন।

গওহার নঈম ওয়ারা

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।